শুভেন্দু অধিকারী জীবনী: ছাত্রনেতা থেকে বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী, কিরকম ছিল শুভেন্দু অধিকারীর সফর?

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক জগতে বর্তমানে সর্বাধিক আলোচিত ব্যক্তিত্ব হলেন শুভেন্দু অধিকারী। ২০২৬ এর মে মাসে তিনি পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তবে জীবনের এই পথ একেবারে মসৃণ ছিল না। প্রাথমিক জীবনে এক গ্ৰাম্য সাধারণ যুবক হিসেবেই তার যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি হয়ে ওঠেন বঙ্গ রাজনীতিতে এক সেনসেশন। শুভেন্দু অধিকারী জীবনী নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে আজকে জেনে নেব কেমন ছিল তার জীবনের এই সফর।

নাম

শুভেন্দু অধিকারী।

জন্ম

১৫ ডিসেম্বর, ১৯৭০ (কাঁথি, পূর্ব মেদিনীপুর)।

দল

ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)।

বর্তমান পদ

মুখ্যমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ (২০২৬ – বর্তমান)

পুর্ববর্তী পদ

বিরোধী দলনেতা, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা (২০২১-২০২৬)।

শুভেন্দু অধিকারী ব্যক্তিগত জীবন

শুভেন্দু অধিকারী ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭০ সালে পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথির এক রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা শিশির অধিকারী, যিনি একজন সাংসদ এবং মনমোহন সিং সরকারের পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। তার মা ছিলেন গায়ত্রী অধিকারী।

শুভেন্দু অধিকারী শিক্ষাগত যোগ্যতা

শুভেন্দু কাঁথি হাই স্কুল থেকে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীকালে কাঁথি প্রভাত কুমার কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর (MA) ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও পড়াশোনা করেন।

শুভেন্দু অধিকারী রাজনৈতিক জীবন

প্রাথমিক রাজনৈতিক জীবন

৮০ দশকের শেষের দিকে কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্র পরিষদ’-এর হাত ধরে শুভেন্দুর রাজনৈতিক জগতে হাতেখড়ি হয়। ১৯৯৫ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি প্রথমবার কাঁথি পুরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৯৮ সালে মমতা ব্যানার্জী যখন তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) প্রতিষ্ঠা করেন, তখন বাবা শিশির অধিকারীর সাথে শুভেন্দুও কংগ্রেসে ছেড়ে নতুন দলে যোগ দেন। ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মুগবেড়িয়া থেকে পরাজিত হলেও, ২০০৬ সালে তিনি কাঁথি দক্ষিণ থেকে প্রথমবার বিধায়ক নির্বাচিত হন।

২০০৭ এর নন্দীগ্রাম আন্দোলন

শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে বড় মোড় ছিল নন্দীগ্রাম আন্দোলন। ২০০৭ সালে বামফ্রন্ট সরকারের শিল্পায়নের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে নন্দীগ্রামে ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’র নেতৃত্বে তিনি অগ্রণী ভূমিকা নেন। মমতা ব্যানার্জীর বিশ্বস্ত সৈনিক হিসেবে তিনি নন্দীগ্রাম ও জঙ্গলমহল এলাকায় তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেন।

প্রথম সাংসদ

এই সাফল্যের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাকে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে জঙ্গলমহলের বাকি এলাকায় দায়িত্ব দেন। সেখানেও তিনি তৃণমূলের ভিত মজবুত করেন। পরে ২০০৯ এবং ২০১৪ সালে তিনি তমলুক লোকসভা কেন্দ্র থেকে সাংসদ (MP) নির্বাচিত হন। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি নন্দীগ্রাম থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন এবং মমতা ব্যানার্জীর মন্ত্রিসভায় পরিবহণ ও সেচ মন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান।

২০২০ তে দলবদল

২০২০ সালের শেষের দিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে মতবিরোধের জেরে তিনি মন্ত্রীপদ এবং দল ত্যাগ করেন। একই বছরের ১৯ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের হাত ধরে মেদিনীপুরের জনসভায় তিনি ভারতীয় জনতা পার্টিতে (BJP) যোগ দেন।

২০২১-২০২৬ এ বিরোধী দলনেতার দায়িত্ব

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি নন্দীগ্রাম কেন্দ্র থেকে তৃণমূল প্রার্থী মমতা ব্যানার্জীকে পরাজিত করে চমক সৃষ্টি করেন। যদিও বিজেপি রাজ্যে জিততে পারেনি, কিন্তু রাজ্যে ভারতীয় জনতা পার্টির সম্প্রসারণ ঘটাতে তার অবদান উল্লেখযোগ্য।

২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন শুভেন্দুর রাজনৈতিক জীবনের অধ্যায় বদলে দেয়। প্রথমবার তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নন্দীগ্রামে ১৯৫৬ এবং ভবানীপুরে ১৫ হাজার ভোটে তিনি পরাজিত করেন। শুধু তাই নয়, সমগ্র রাজ্যে মোট ২০৭ আসনে অভাবনীয়ভাবে জয়লাভ করে বাংলায় প্রথমবারের মতো বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। আর সেই সরকারের নতুন মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন শুভেন্দু অধিকারী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *