রাজ্যে নতুন সরকার গঠন হবার পর থেকেই বিভিন্ন দপ্তরে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। এই প্রসঙ্গে আগের চালু হওয়া কিছু প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাবে নাকি, এই নিয়ে অনেকের মনেই সন্দেহ রয়েছে। এইসব প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম হলো উচ্চমাধ্যমিক পড়ুয়াদের জন্য চালু হওয়া ‘তরুণের স্বপ্ন ‘ প্রকল্প। এই প্রকল্পের অধীনে ছাত্র-ছাত্রীদের ট্যাবলেট বা স্মার্টফোন কেনার জন্য এককালীন ১০,০০০ টাকা করে অনুদান দেওয়া হত। তবে সম্প্রতি বিকাশ ভবনে শিক্ষা দফতরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর অনেকের সন্দেহ, ‘তরুণের স্বপ্ন’ প্রকল্প কি বন্ধ হচ্ছে? এ ব্যাপারে নতুন সরকারের সিদ্ধান্ত কি? সরাসরি জেনে নেব আজকের প্রতিবেদনে।
শিক্ষকদের একাংশ এবং শিক্ষা মহলের একটি বড় পক্ষ দাবি করছেন, প্রতি বছর ট্যাবের পেছনে এই বিপুল অর্থ ব্যয় না করে, সেই টাকা সরকারি স্কুলগুলির পরিকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা হোক। অন্যদিকে, এই ডিজিটাল যুগে দুস্থ পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য অনেকেই এই প্রকল্প জারি রাখার পক্ষেও যুক্তি খাড়া করেছেন।
তরুণের স্বপ্ন প্রকল্প কী এবং কেন শুরু হয়েছিল?
২০২০ সালের করোনা অতিমারি দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিয়েছিল। টানা লকডাউনের কারণে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় শুরু হয় অনলাইন ক্লাস। এই পরিস্থিতিতে শহুরে বা সচ্ছল পরিবারের ছেলেমেয়েরা স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটের সুবিধা পেলেও, গ্রামীণ ও নিম্নবিত্ত পরিবারের পড়ুয়ারা পিছিয়ে ছিল দৌড়ে। তাই ২০২১ সালে তৎকালীন তৃণমূল সরকার একাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের জন্য ‘তরুণের স্বপ্ন’ প্রকল্প চালু করে। এই প্রকল্পের আওতায় ডিজিটাল ডিভাইস যেমন, ট্যাব বা স্মার্টফোন কেনার জন্য সরাসরি ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১০,০০০ টাকা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ফলে অনেক দুস্থ ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার থেকে রক্ষা পায়।
কেন বন্ধ হতে পারে এই প্রকল্প?
রাজ্যে সরকার বদলের পরই ‘তরুণের স্বপ্ন’ প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন শিক্ষকদের একাংশ। বিকাশ ভবনে বিজেপির বিধায়ক দল এবং শিক্ষা দফতরের সাম্প্রতিক বৈঠকে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। শিক্ষকদের একটি বড় অংশ এই প্রকল্প বন্ধের পেছনে একাধিক যুক্তি দিয়েছেন:
১. শিক্ষকদের অভিযোগ, অনেক পড়ুয়া কেবল ট্যাব কেনার লোভেই নতুন ক্লাসে ভর্তি হচ্ছে। আর ট্যাব কেনার টাকা পেয়ে গেলে আর স্কুলে আসছে না। ২০২৪ সালের উচ্চ মাধ্যমিকের টেস্ট পরীক্ষা বা মূল উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় মোট নথিভুক্ত পড়ুয়ার তুলনায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমে গিয়েছে বলে জানা গেছে।
২. সরকারপক্ষ পড়াশোনার সুবিধার্থে ট্যাব কেনার টাকা দিলেও শিক্ষকদের অভিযোগ এর ফলে উল্টে ইন্টারনেটে আসক্তি, সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘রিলস’ বানানোর প্রবণতা এবং গেমিংয়ের নেশায় পড়ুয়ারা ডুবে যাচ্ছে।
৩. বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল এই বিষয়ে স্পষ্ট জানান, “ট্যাবের এই খাতে প্রতি বছর সরকারের একটি বিশাল অঙ্কের টাকা ব্যয় হয়। এই টাকা যদি স্কুলগুলির পরিকাঠামো, ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি এবং শ্রেণিকক্ষ উন্নত করার কাজে লাগানো যায়, তবে তা শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নে অনেক বেশি কার্যকর হবে।”
৪. এছাড়াও’তরুণের স্বপ্ন’ প্রকল্প ঘিরে গত বছরগুলিতে কম বিতর্ক হয়নি। ২০২৪ সালে রাজ্যজুড়ে বহু প্রকৃত পড়ুয়ার টাকা হ্যাকার বা ভুয়ো ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে যাওয়ার ঘটনা শোনা গিয়েছিল।
প্রকল্প চালু রাখার পক্ষেও রয়েছে জোরালো যুক্তি
তবে এতসব বিতর্কের মাঝেও এই প্রকল্প যে শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য তৈরি এবং এর ফলে এই পাঁচ বছরে বহু দরিদ্র পড়ুয়া যে উপকৃত হয়েছে, তা কোনভাবেই অস্বীকার করার নয়। এই যুক্তি খাড়া করে অনেক শিক্ষকই এই প্রকল্প চালিয়ে যাওয়ার দিকে বার্তা দিয়েছেন।
বর্তমান সরকারের অবস্থান কী?
রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, জনমুখী ও সমাজকল্যাণমূলক কোনো প্রকল্পই বন্ধ করা হবে না। তবে এক্ষেত্রে কিছু ফিল্টারিং পলিসি আনা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। শিক্ষকদের একাংশের মত, যদি এই প্রকল্প চালাতে হয়, তবে স্বচ্ছ এবং সঠিক ভাবে চালাতে হবে। যেমন, নির্দিষ্ট আয়সীমার নীচে পড়ুয়াদের সুবিধা দেওয়া, একাদশ শ্রেণীতে ছাত্রছাত্রীদের নির্দিষ্ট উপস্থিতি ও নম্বর থাকলে তবেই সুবিধা দেওয়া, এবং সর্বোপরি, দুর্নীতি রুখতে সরাসরি টাকা না দিয়ে স্কুল মারফত গ্যাজেট বিতরণ করা ইত্যাদি। এখনো অবশ্য নতুন সরকারের তরফে কোনো কিছুরই ইঙ্গিত মেলেনি। তবে এ নিয়ে আগামী দিনে কোন আপডেট এলেই তা এখানে জানানো হবে।