তৈরি হল ‘সিলেবাস-কাম-কারিকুলাম’ কমিটি’, প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সিলেবাসে আসবে বড় বদল


পশ্চিমবঙ্গের স্কুল শিক্ষায় আমূল পরিবর্তন আসতে চলেছে। রাজ্যের স্কুল শিক্ষা দফতর (WB School Education Department) মারফত গত ২৪ জুলাই এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বর্তমান পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং পাঠ্যপুস্তক পুনর্বিবেচনা করার লক্ষ্যে তৈরি হল ‘সিলেবাস-কাম-কারিকুলাম’ কমিটি (Syllabus cum Curriculum Committee)। ২৪ জুলাই বিকাশ ভবনে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। নতুন এই কমিটির মূল উদ্দেশ্য হলো রাজ্যের সামগ্রিক স্কুল শিক্ষাকে জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP 2020) এবং জাতীয় পাঠ্যক্রম কাঠামোর (NCF) আধুনিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা।

বর্তমান যুগে শিক্ষার ধরণ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাবিদদের একাংশ দাবি করে আসছিলেন যে, রাজ্যের বর্তমান পাঠ্যক্রম কিছুটা প্রাচীনপন্থী এবং তা জাতীয় স্তরের বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ক্ষেত্রে পড়ুয়াদের পিছিয়ে দিচ্ছে। এই খামতি পূরণ করতেই রাজ্য সরকার এই নতুন কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কেন তৈরি হল এই ‘সিলেবাস-কাম-কারিকুলাম’ কমিটি?

সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এই কমিটিকে কেবল পাঠ্যবই পরিবর্তনের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি, বরং সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নের এক রূপরেখা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিটির প্রধান কাজের ক্ষেত্রগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:

জাতীয় শিক্ষানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য

জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP 2020), ফাউন্ডেশনাল স্টেজের জাতীয় পাঠ্যক্রম কাঠামো (NCF-FS 2022) এবং স্কুল শিক্ষার জাতীয় পাঠ্যক্রম কাঠামো (NCF-SE 2023) অনুযায়ী রাজ্যের সিলেবাসের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সুপারিশ করা।

মুখস্থ বিদ্যা ও গাইডবই সংস্কৃতির অবসান

বর্তমানে বাজারে চলতি গাইডবই বা নোটবইয়ের ওপর পড়ুয়াদের নির্ভরশীলতা অত্যন্ত বেশি। নতুন কমিটি এমন একটি পাঠ্যক্রম সুপারিশ করবে, যেখানে পড়ুয়ারা প্রশ্ন করার মাধ্যমে শিখবে (Enquiry-based and Child-centric Learning)। এর ফলে গাইডবইয়ের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার বন্ধ হবে।

বেসরকারি গৃহশিক্ষকতা বা প্রাইভেট টিউশনের দাপট কমানো

আজকের দিনে স্কুল শিক্ষার সমান্তরালে কোচিং সেন্টার এবং প্রাইভেট টিউশনের রমরমা বাজার তৈরি হয়েছে। শিক্ষা দফতরের লক্ষ্য হলো, স্কুলের শ্রেণিকক্ষকেই পঠনপাঠনের মূল কেন্দ্র করে তোলা। শিক্ষাদানের পদ্ধতিকে এতটাই আকর্ষণীয় ও কার্যকর করা হবে যাতে শিক্ষার্থীদের স্কুলের বাইরে আলাদা করে টিউশন নেওয়ার প্রয়োজন না পড়ে।

আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত মূল্যায়ন পদ্ধতি

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বিভিন্ন বোর্ড এবং কাউন্সিলের বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতি খতিয়ে দেখবে এই কমিটি। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পরীক্ষা পদ্ধতিতে সেমিস্টার সিস্টেম বা অবজেক্টিভ টাইপ মাল্টিপল চয়েস কোশ্চেন (MCQ) এবং ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্টের ওপর কীভাবে আরও জোর দেওয়া যায়, তা বৈজ্ঞানিকভাবে খতিয়ে দেখে সুপারিশ করবে এই কমিটি।

মানসিক চাপ কমানো

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের মূল্যায়ন পদ্ধতিকে এমনভাবে সাজানো যাতে শিক্ষার্থীদের অযথা পরীক্ষার ভয় বা মানসিক চাপের মধ্যে পড়তে না হয়।

আরও পড়ুনঃ ফের চালু হল ‘মর্নিং স্কুল’, কি কারণে ও কতদিন চলবে?

শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আধুনিকীকরণ

শুধুমাত্র সিলেবাস বদলালেই শিক্ষার মান উন্নত হয় না, তার জন্য প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক। তাই শিক্ষকদের আধুনিক অডিও-ভিজ্যুয়াল মাধ্যম, ডিজিটাল লার্নিং ও উন্নত শিক্ষণ পদ্ধতিতে অভ্যস্ত করে তুলতে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির (Teacher Training Programs) রূপরেখাও তৈরি করবে এই প্যানেল।

কারা কারা এই কমিটির সদস্য?

এই উচ্চপর্যায়ের কমিটিতে থাকবেন রাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের নামী অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ, বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ স্কুল শিক্ষক-শিক্ষিকারা। গণিত, বিজ্ঞান, বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, ভূগোল, কর্মশিক্ষা এবং শারীরশিক্ষার মতো প্রতিটি প্রধান বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের এই প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কমিটি তাদের সমস্ত প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করবে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) অফিস থেকে।
এই কমিটির যাবতীয় প্রশাসনিক খরচ এবং আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে ‘সমগ্র শিক্ষা মিশন’ (Samagra Shiksha Mission)-এর প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ফান্ড থেকে।
কমিটির বেসরকারি সদস্যদের এই কাজের জন্য মাসিক ১০,০০০ টাকা সাম্মানিক প্রদান করা হবে।

কবে থেকে লাগু হতে পারে নতুন সিলেবাস?

শিক্ষা দফতরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কমিটিকে খুব দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিটি তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকের ২ মাসের মধ্যে একটি প্রাথমিক বা অন্তর্বর্তী রিপোর্ট পেশ করবে। এর পর শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, অভিভাবক এবং শিক্ষা প্রশাসকদের মতো বিভিন্ন অংশীদারদের থেকে মতামত বা ফিডব্যাক নেওয়া হবে। সমস্ত মতামত খতিয়ে দেখে প্রথম বৈঠকের ৩ মাসের মধ্যে চূড়ান্ত রিপোর্ট সরকারের কাছে জমা দিতে হবে। শিক্ষা দফতর স্পষ্ট জানিয়েছে যে, এখনই ছাত্র-ছাত্রীদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। কমিটি প্রথমে বর্তমান কাঠামো খতিয়ে দেখে তাদের সুপারিশ জমা দেবে। সরকার সেই সুপারিশ খতিয়ে দেখে সবুজ সংকেত দেওয়ার পরেই ধাপে ধাপে নতুন পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষাবর্ষে তা কার্যকর করা হবে।

এতে কি উপকার হবে?

সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন রাজ্যের শিক্ষা মহলের সিংহভাগ সদস্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় স্তরের শিক্ষানীতির (NEP 2020) সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে বাংলার ছাত্র-ছাত্রীরা সর্বভারতীয় স্তরের পরীক্ষা যেমন JEE, NEET বা CUET-এর ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকত। তবে নতুন সিলেবাস তৈরির সময় যাতে বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয়, সেদিকেও নজর রাখার দাবি জানিয়েছেন অনেকে। শ্রেণিকক্ষে পরিকাঠামোর উন্নয়ন এবং ডিজিটাল ক্লাসরুম তৈরি করাও এই সংস্কার সফল করার অন্যতম প্রধান শর্ত বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।

আরও পড়ুনঃ স্কুল চলাকালীন মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ! বিজ্ঞপ্তি WBCHSE এর

শিক্ষা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ আপডেট সবার আগে পেতে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে যুক্ত হন👇

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *