পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত মহিলাদের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার ফর্ম প্রকাশ পেয়েছে। তবে ফর্ম দেখে অনেকেরই খুশি হওয়ার বদলে মাথায় হাত পড়েছে। একেবারে ১২ পাতার লম্বা ফর্ম, পরিবারের খুঁটিনাটি সমস্ত তথ্য ফর্মে চাওয়া হয়েছে। তাই মনে রাখবেন খুব মনোযোগ দিয়ে সঠিকভাবে ফর্ম ফিলাপ না করলে আপনার আবেদন কিন্তু সহজেই বাতিল হতে পারে। এই বিষয়ে আপনাকে সাহায্য করার জন্যই আজকের প্রতিবেদন। অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার ফর্ম ফিলাপ কিভাবে করবেন? তার বিস্তারিত এবং সহজ গাইড এখানে দেওয়া হয়েছে। আপনি যদি অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের একজন আবেদনকারী হন, তবে প্রতিবেদনটি অবশ্যই মনোযোগ সহকারে পড়ুন।
অন্নপূর্ণা যোজনা পারিবারিক তথ্য সংগ্রহের ফর্মটিতে একটি পরিবারের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পেশাগত অবস্থার খতিয়ান নেওয়া হচ্ছে। সরকারি সুবিধা সরাসরি প্রকৃত প্রাপকের কাছে পৌঁছে দিতে এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখতেই এই ডেটা সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। ফর্মে মোট ৮টি মূল বিভাগ (Section ‘ক’ থেকে ‘জ’) রয়েছে এবং প্রতিটি বিভাগ পূরণ করা বাধ্যতামূলক।
অন্নপূর্ণা ভান্ডার ফর্ম ফিলাপ কিভাবে করবেন?
বিভাগ ‘ক’: পারিবারিক পরিচয়
এই বিভাগে পরিবারের প্রধান (Head of the Family বা HOF) এবং বাকি সদস্যদের ব্যক্তিগত তথ্য দিতে হবে।
১. পরিবারের প্রধানের নাম তার আধার কার্ড অনুযায়ী লিখতে হবে।
২. প্রধানের জন্ম তারিখ দিন-মাস-বছর ফরম্যাটে দিতে হবে।
৩. প্রধানের লিঙ্গ পুরুষ না মহিলা তা বাছতে হবে।
৪. পরিবারের প্রধানের আধার নম্বর লিখতে হবে।
৫. প্রধানের ডিজিটাল রেশন কার্ডের আইডি যদি থাকে তা লিখতে হবে।
৬. পরিবারের মোট সদস্য কতজন সেটি সংখ্যায় লিখতে হবে।
৭. পরিবারের যেটি স্থায়ী ঠিকানা সেটি লিখতে হবে।
৮. HOF-এর আধারের সাথে যুক্ত সচল মোবাইল নম্বরটি দিতে হবে।
৯. পরিবারের বাকি সদস্যদের নাম, জন্ম তারিখ, লিঙ্গ, আধার নম্বর এবং প্রধানের সাথে সম্পর্ক লিখতে হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: কোনো সদস্যের বয়স ৫ বছরের কম হলে এবং আধার কার্ড না থাকলে আধার নম্বরের জায়গায় ‘NA’ লিখতে পারেন।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ভোটার কার্ডের বিবরণ (বিভাগ ‘ক’-এর অংশ)
১০. সরকারি আর্থিক অনুদান সরাসরি অ্যাকাউন্টে পাওয়ার জন্য (Direct Benefit Transfer) পরিবারের প্রধান এবং সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যের আধার লিঙ্কযুক্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, ব্যাংকের নাম এবং IFSC কোড দিতে হবে।
১১. HOF সহ সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যের ভোটার কার্ড নম্বর, বিধানসভা ক্ষেত্রের নাম এবং অংশ (Part) নম্বর উল্লেখ করতে হবে।
১২. আবেদনকারী কোন শ্রেণির অন্তর্গত (UR / UR-EWS / SC / ST / OBC / PVTG) তা উল্লেখ করে উপযুক্ত শংসাপত্র যুক্ত করতে হবে।
বিভাগ ‘খ’: রেশন কার্ড ও খাদ্য ভর্তুকি
১. আপনার ডিজিটাল রেশন কার্ড আছে কি না (হ্যাঁ/না) তা জানাতে হবে।
২. থাকলে কার্ডের ধরন (AAY, PHH, SPHH, RKSY1, RKSY2 বা ভর্তুকিহীন) বেছে নিতে হবে।
৩. পরিবারটি নিয়মিত রেশন দোকান থেকে মাসিক খাদ্যশস্য তুলছে কি না, তা টিক চিহ্নের মাধ্যমে জানাতে হবে।
বিভাগ ‘গ’: পারিবারিক সম্পদ ও সম্পত্তি
১. বাড়িতে ৩টি বা তার বেশি পাকা ঘর রয়েছে কি না তা উল্লেখ করতে হবে।
২. পরিবারের কোনো সদস্যের নামে কোন জমি আছে কিনা তা চিহ্নিত করতে হবে।
৩. পরিবারের সকল সদস্যের মোট জমির পরিমাণ (শতক এককে) লিখতে হবে। এর সাথে মিউটেশনের কপি বা আরআর (RoR) নথির কপি জমা দিতে হবে।
৪. পরিবারের কারও নামে কোনো অ-বাণিজ্যিক চার চাকার গাড়ি (গাড়ি, জিপ, ট্রাক্টর) থাকলে হ্যাঁ লিখে গাড়ির মডেল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিতে হবে। অন্যথায় না চিহ্নিত করুন।
৫. পরিবারের সদস্যদের সরকারি বা বেসরকারি কোনো স্বাস্থ্যবিমা থাকলে বিমার অঙ্ক ও প্রিমিয়ামের বিবরণ দিতে হবে।
বিভাগ ‘ঘ’: আয় ও পেশার বিবরণ
১. পরিবারের কেউ আয়কর বা পেশাগত কর দেন কি না তা জানাতে হবে।
২. পরিবারের কোনো সদস্যের প্যান কার্ড আছে কি না তা চিহ্নিত করতে হবে। যাদের প্যান কার্ড আছে তাদের নাম এবং প্যান কার্ড নম্বর লিখতে হবে।
৩. পরিবারের সকল সদস্যের কর্মসংস্থানের ধরন (সরকারি ক্ষেত্র, বেসরকারি বেতনভুক্ত, সংগঠিত/অসংগঠিত ক্ষেত্রে স্বনিযুক্ত, পরিযায়ী শ্রমিক বা বেকার) সঠিকভাবে বাছতে হবে।
৪. পরিবারের শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত সদস্যদের সংখ্যা লিখতে হবে। কোন সদস্যের সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা কত, উল্লেখ করতে হবে।
৫. পরিবারে কেউ প্রাক্তন বা বর্তমান মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক, পঞ্চায়েত বা পৌরসভার পদাধিকারী হলে লিখতে হবে।
৬. পরিবারের কোনো সদস্য সরকারি পেনশনভোগী হলে তা জানাতে হবে।
৭. কোন সদস্যের নাম যদি জিএসটি করদাতাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকে তা জানাতে হবে।
৮. পুরো পরিবারের মোট বার্ষিক আয় কত টাকা, তা সংখ্যায় লিখতে হবে।
বিভাগ ‘ঙ’: অন্যান্য পরিচয় ও আইনি নথি
১. পরিবারের কোনো সদস্য যদি নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা CAA তে আবেদন করে থাকেন, তা চিহ্নিত করতে হবে। কারও ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য হলে নির্দিষ্ট আবেদন নম্বর দিতে হবে।
২. পরিবারের কোনো সদস্যের কিসান ক্রেডিট কার্ড (KCC), শিল্পী বা মৎস্যজীবী ক্রেডিট কার্ড, অথবা স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড থাকলে তার নম্বর, মোট আইডির সংখ্যা এবং কত তারিখে কার্ড ইস্যু করা হয়েছে তার তথ্য দিতে হবে।
৩. যদি SIR ২০২৬-এ কারও নাম বাদ পড়ে থাকে এবং সেই মামলা ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন থাকে, তবে তা চিহ্নিত করতে হবে।
বিভাগ ‘চ’: সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষা, টিকাকরণ
১. পরিবারের যে শিশুরা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে তাদের নাম, শ্রেণি, স্কুলের নাম এবং স্কুলের ধরন (সরকারি/বেসরকারি/মাদ্রাসা) চিহ্নিত করতে হবে।
২. শিশুদের টিকাকরণের বর্তমান অবস্থা এবং সম্পূর্ণ হয়ে থাকলে টিকাকরণ কার্ডের আইডি দিতে হবে। টিকাকরণ না হলে কেন নেওয়া হয়নি তার কারণ জানাতে হবে।
বিভাগ ‘ছ’: চলতি সরকারি প্রকল্পের সুবিধা
১. পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে অন্য কোনো সরকারি সুবিধা (যেমন কোনো DBT প্রকল্প) পাচ্ছেন কি না উল্লেখ করতে হবে। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের নাম মোট যতগুলি প্রকল্পে আছে সবগুলির নাম লিখতে হবে।
২. যদি তথ্য মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তবে অফিসার এই অংশে আপনার নাম বাতিল হবার কারণ উল্লেখ করবেন।
বিভাগ ‘জ’: ঘোষণা ও সম্মতি
ফর্মের শেষে আবেদনকারীকে সই বা টিপছাপ দিয়ে এই মর্মে ঘোষণা করতে হবে যে প্রদত্ত সমস্ত তথ্য সত্য। কোনো তথ্য মিথ্যা প্রমাণিত হলে সামাজিক সুরক্ষার সমস্ত সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
আবেদনপত্রের সাথে কী কী নথি জমা দেবেন?
অনলাইনে বা অফলাইনে ফর্ম ফিলাপের সময়ে নিম্নলিখিত নথির অরিজিনাল স্ক্যান করা কপি বা সেলফ অ্যাটেস্টেড করা জেরক্স কপি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক:
১. পরিবারের প্রধান এবং সকল সদস্যের আধার কার্ড।
২. আধার লিঙ্কযুক্ত ব্যাংক পাসবইয়ের প্রথম পাতা।
৩. ডিজিটাল রেশন কার্ড।
৪. ভোটার আইডি কার্ড।
৫. জাতিগত বা ইডব্লিউএস (EWS) শংসাপত্র (যদি প্রযোজ্য হয়)।
৬. জমির খতিয়ান/মিউটেশন বা RoR-এর কপি।
৭. প্যান কার্ড (যদি থাকে)।
৮. শিশুদের স্কুলের আইডেন্টিটি কার্ড এবং টিকাকরণ কার্ড।